জলপাই আমাদের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি টক জাতীয় ফল। শীতের আগেই বাজারে আসতে শুরু করে জলপাই। সাধারণত এটি ডালের সঙ্গে, টক জাতীয় খাবার তৈরিতে অথবা আচার হিসেবে খাওয়া হয়। তবে কাঁচা জলপাইয়ে রয়েছে অনেক বেশি পুষ্টিগুণ, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
আজ আমরা জানব জলপাই-এর অজানা সকল পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা সম্পর্কে।
প্রতি ১০০ গ্রাম জলপাইয়ে রয়েছে:
জলপাই-এর উপকারিতা সংক্ষেপে বলে শেষ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষুদ্র এই ফলের মাধ্যমে মানুষ স্বাস্থ্যগত উপকার পেয়ে আসছে বলেই এর এত কদর। আর তাই তো বেশি দাম হওয়া সত্ত্বেও ডক্টরদের পরামর্শ অনুযায়ী জলপাই এর তেল বা অলিভ অয়েল (Olive oil) এর ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।
চলুন জলপাই-এর সকল প্রকার উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:
১. পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত: জলপাইয়ের খোসায় প্রচুর আঁশ রয়েছে যা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে। এটি গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। আঁশ খাবার হজমকে সহজ করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। জলপাই নিয়মিত খেলে বিপাকক্রিয়ার ভারসাম্য বজায় থাকে এবং পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা কমে।
২. হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: জলপাইয়ে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। এটি রক্তনালীর গঠনকে সুস্থ রাখে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। জলপাইয়ের তেলে থাকা মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক: কালো জলপাই ভিটামিন ই-এর একটি বড় উৎস, যা শরীরে মুক্ত কণিকাকে ধ্বংস করে। এই ভিটামিন কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধ করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। নিয়মিত জলপাই খাওয়ার মাধ্যমে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক।
৪. ত্বক ও চুলের যত্নে কার্যকর: জলপাইয়ের তেলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বক ও চুলের যত্নে সহায়ক। এটি চুলের গোড়া মজবুত করে এবং চুল পড়া কমায়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ত্বকের যে ক্ষতি হয়, তা রোধ করতে জলপাই খুবই কার্যকর। নিয়মিত জলপাই তেল ব্যবহারে ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল হয়।
৫. হাড়ের ক্ষয় রোধ করে: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। জলপাইয়ের মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট প্রদাহবিরোধী উপাদান হিসেবে কাজ করে এবং হাড়ের ক্ষয় রোধ করে। এটি হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৬. লৌহের ঘাটতি পূরণ: জলপাই লৌহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে সহায়তা করে। লৌহের অভাবে রক্তাল্পতা, দুর্বলতা এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। জলপাই রক্তের লোহিত কণিকা তৈরিতে সহায়তা করে এবং লৌহের অভাবজনিত সমস্যাগুলো দূর করে।
৭. চোখের জন্য উপকারী: জলপাইয়ে ভিটামিন এ প্রচুর পরিমাণে থাকে, যা রাতকানা রোগ এবং চোখের সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক। এটি চোখের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে এবং চোখের লালভাব বা অস্বস্তি দূর করতে কার্যকর।
৮. পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়: পিত্তথলিতে পাথর হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা। এটি পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি সৃষ্টি করতে পারে। জলপাই পিত্তথলিতে পাথর তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। এটি পিত্তরসের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং পিত্তথলিতে পাথর জমার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
৯. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে: ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করে। জলপাইয়ের আঁশ এবং মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিসের জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১০. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: জলপাইয়ে থাকা ভিটামিন সি এবং প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি সর্দি, জ্বর এবং অন্যান্য সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং শরীরকে সুস্থ রাখে।
যদিও জলপাই অত্যন্ত পুষ্টিকর, তবে অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। অতিরিক্ত খেলে ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিক ও বমির মতো সমস্যা হতে পারে। যাদের লো ব্লাড প্রেসার বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের জলপাই খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
অতিরিক্ত পরিমাণে না খেলে কোন ধরণের অপকারিতার সম্মুখীন হতে হবে না বললেই চলে।
জলপাই খাওয়ার উপযুক্ত নিয়ম জানা থাকলে এটি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বাড়াতে এবং সঠিক পুষ্টি সরবরাহে ভূমিকা পালন করে। জলপাই খাওয়ার নিয়ম ও উপযুক্ত পদ্ধতি নিম্নরূপ:
১. কাঁচা বা সিদ্ধ করে খাওয়া: জলপাই কাঁচা খাওয়া সম্ভব হলেও কখনও কখনও এটি কষযুক্ত হতে পারে। তাই সিদ্ধ করে খাওয়াই শ্রেয়। এতে এটি সহজেই হজম হয়। সিদ্ধ করার সময় সামান্য লবণ মেশানো যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত লবণ এড়ানো উচিত। সিদ্ধ জলপাই সরাসরি অথবা সালাদের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
২. পরিমাণমত খাওয়া: জলপাই খুব বেশি পরিমাণে খাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ এতে ক্যালরি এবং সোডিয়াম বেশি থাকে। দৈনিক ৫-৬ টি জলপাই খাওয়া যেতে পারে।
৩. আচার হিসেবে খাওয়া: যদি আচার হিসেবে খেতে চান, তাহলে জলপাইকে অতিরিক্ত লবণ বা ভিনেগার ছাড়া খাওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ এসব উপাদান বেশি পরিমাণে খেলে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের দেশে জলপাইয়ের আচার অন্যতম মুখরোচক খাবার।
৪. জলপাইয়ের তেল (Olive oil) ব্যবহার: জলপাইয়ের তেল বা অলিভ অয়েল অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, যা বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা যায়। রান্নার সময় জলপাই তেল ব্যবহার করা ভালো কারণ এতে অমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক। এছাড়া সালাদ বা স্যুপের সাথে তেল ছিটিয়ে খেলে স্বাদ বাড়ে এবং পুষ্টিগুণ মেলে।
আমাদের দেশে সারা বছর জলপাই পাওয়া না গেলেও জলপাইয়ের আঁচার সারা বছর সংরক্ষণ করে রাখা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ফ্রোজেন জলপাইয়ের থেকে টাটকা জলপাই আচার তৈরি করার জন্য সব থেকে বেশি ভালো।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় জলপাই বা এর তেল অন্তর্ভুক্ত করার আগে এর পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পরিমাণে জলপাই খেলে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি আমাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
Share - Facebook
জলপাই একটি পুষ্টিকর ফল, যা পরিপাকতন্ত্র, হৃদরোগ, ক্যান্সার, ত্বক ও চুলের যত্নে উপকারী। এটি হাড়ের ক্ষয় রোধ, লৌহের অভাব পূরণ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে। তবে, অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলগুলোর মধ্যে আম শীর্ষে। ফলের রাজা আম শুধু স্বাদের জন্যই নয়, অসংখ্য পুষ্টিগুনাগুণের জন্যও বিখ্যাত। চলুন জেনে নিই আম খাওয়ার অজানা কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা।